শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:৩২ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
করোনায় মৃত্যুবরণ করা এক যুবকের শেষ কথাগুলো গ্রাজুয়েট নার্সিং কোর্সের শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানালেন ড. মোহাম্মদ ইউনুস চিকিৎসক, নার্স সহ শীঘ্রই ২০ হাজার নিয়োগ আসছেঃ স্বাস্থ্যমন্ত্রী দারিদ্র ও মেধাবীদের লোনের মাধ্যমে ডিপ্লোমা নার্সিং কোর্সে অধ্যায়নের সুযোগ করোনা ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া সাময়িক স্থগিত করেছে সৌদি সরকার। রাজধানীর দুই নার্সিং শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলো সিলেট ওসমানী বিএনএ বাংলাদেশের নার্সিং শিক্ষা মান্ধাতার আমলেরঃ চট্টগ্রাম মেডিকেলের সাবেক অধ্যক্ষ সেবা নিশ্চিত করতে নার্সদের অভিযোগ সরাসরি জানাতে বললেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বিভাগীয় পর্যায়ে আইসিইউ প্রশিক্ষণ চালু রাখায় ওসমানী বিএনএ’র কৃতজ্ঞতা কক্সবাজারে ৮৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরির সুযোগ বিএসএমএমইউ’তে গ্রাজুয়েট নার্সিং শিক্ষার্থীদের ক্যাপিং সেরিমনি অনুষ্ঠিত

দি রিয়্যাল কোভিড হিরো

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২০
  • ৯৪০ Time View

লেখক-
ইমাম হোসেন
নার্সিং অফিসার
এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
প্রকাশকঃ মতিউর রহমান
২১.০৫.২০২০

খোলা জানালায় রাতের নিরবতা জানান দেয় পৃথিবী আজও শান্ত, সুন্দর আর বাসযোগ্য। চোখের সামনে ভেসেঁ আসে উদারতার এক অসীম প্রান্তর। কিন্তু আজ আর অপলকে আকাশপানে তাকিয়েও সেই অনুভূতি আসেনা নার্স মিতুর ভাবুক হ্নদয়ে। চারিদিকে যেন নির্মমতার বিষ ছড়িয়ে দিল করোনা। ভেঙেছে পারিবারিক অটুট বন্ধন, বাধঁ ফেলেছে মা-বাবা আর সন্তানের অকৃত্রিম ভালবাসার স্রোতেও। এসব অগনিত চিন্তার ভিড়ে সহসাই যেন অনেকটা বৃষ্টি হয়ে ঘুম নেমে আসে মিতুর অপলক দৃষ্টিতে।

সকালে ঘুম থেকে ওঠে তড়িঘড়ি করে কোভিড যোদ্ধের জন্য রওয়ানা দিবে মিতু। দুতলার সিঁড়িতে দাঁড়ানো শিশুকন্যা তুলতুল তার বাবার কোলে থেকে ভূবণ জোড়ানো হাসিতে যেন মাকে উৎসাহ দিল, প্রেরণা দিল সম্মুখযোদ্ধে চাঙা থাকার। মিতু বাড়িতে নিচতলায় থাকছে শুধু এই অবুঝ শিশুটির জন্য। দূর থেকে মায়ের অমলিন মুখটি দেখেই ভালো থাকে ছোট্ট তুলতুল। বাচেঁ কোনো একদিন মাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়ার সপ্ন নিয়ে। সব দোষ করোনার, সত্যিই করোনা বড় বেশি অপরাধী।

কোভিড হিরো

নিজের আবেগ, অনুভূতিকে সামলে রাস্তায় নামতেই মিতুর কানে ভেসেঁ আসলো প্রতিবেশী দম্পতির ঝগড়া । যার বিষয়বস্তু মিতুর করোনা যোদ্ধা হওয়া নিয়ে। রাশেদ বলছিল,নার্স মিতু এখন করোনা আপা। সে আমাদের প্রতিবেশী হয়ে থাকলে আমাদের বাচ্চা সমস্যায় পড়বে। কিন্তু স্ত্রী বলছে, ওনাকে নিজ বাসা থেকে চলে যাওয়ার কথা বলা মোটেও ঠিক হবেনা। মিতু তাদের কথায় কর্ণপাত না করে দু-কদম পা বাড়ালো যোদ্ধক্ষেত্র হাসপাতালের পথে। চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে ভেসেঁ উঠলো প্রতিবেশির শিশুটির জন্মলগ্নের প্রেক্ষাপট। সেদিন রাশেদ বলেছিল, মিতু আপা আপনি আমার আশা ভরসার একমাত্র জায়গা। তখন হাসপাতালে তার উপস্থিতিতে তারই পরিচর্যায় জন্ম হয়ছিল শিশুটির। অথচ আজ সেই নার্সই করোনা আপা,নার্সই নাকি শিশুটির জীবনের জন্যে হুমকিস্বরুপ। সব দোষ করোনার,কী নিষ্ঠুর ভাবে রাশেদদের শিখিয়ে দিল বেইমানীর স্থান,কাল,পাত্র বিভাজন!
সহসাই মিতুকে কাটা গায়ে নুন ছিটানোর ন্যায় আরো ব্যাতিত করলো একটি অপ্রত্যাশিত ফোন কল। জমির ফোনে বলতেছে, ম্যাডাম আমি আর আপনার বাসায় দুধ দিতে পারবোনা। কেন? আমিতো আপনায় বলছি গেইটের সামনে রেখে দিতে আর মাসিক বিল ওতো বললাম বিকাশে দিব! কিন্তু ম্যাডাম আপনার সব প্রতিবেশিরা বলছে, আমি যেন করোনা আপার বাসায় দুধ না দেই। ম্যাডাম, আমার মনে হয়ে আপনি এলাকাটা ছেড়ে দিলেই ভালো হবে! আমিতো প্রায় সবার বাসায় দুধ দেই, তারা অনেক ক্ষ্যাপা আপনার ওপরে।
রাগে দুঃখে মিতু তখন কল কেটে দেয়।
মিতুর বৃদ্ধা মায়ের রিযিকেও বুঝি এবার হানা দিল করোন। মা তো দুধ দিয়েই ভাত খেতে পারেন। আর তুলতুলতো বিড়ালের মতো চকচক করে দুধ খেতে ভালবাসে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, করোনা মানবতাকেই ঘপাঘপ গিলে খাওয়ার উল্লাসে মাততে ভালবাসে।

শত ব্যাথা আর বঞ্চনার গ্লানি ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে হাসপাতালের করিডোরে আসে মিতু। নিজেকে লকডাউন করে পিপিই নামের আজিব আবরণে। যে আবরণ স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি কেড়ে নেয় স্বস্তিতে খাওয়াদাওয়া আর শৌচাগারের স্বাধীনতা। মিতুর ন্যায় মুক্ত বিহঙ্গদের বন্দী করে করোনা সেলের নির্মম কারাগারে। তবে আজ মিতুরা এক ভিন্ন আমেজে ব্যাস্ত। আজ পনের জন করোনা রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। তাদের বিদায়কালে ডাক্তার-নার্স সহ সবাই জানালেন ফুলেল শুভেচ্ছা আর মিতু গাইল,,,,,,

আমরা করবো জয়,আমরা করবো জয়
আমরা করবো জয় একদিন
——————————————
we shall overcome one day !

তারপর কোভিড বিজয়ীরা মুক্তির সনদ হাতে ফিরে গেলেন নিজ নিজ গন্তব্যে। রাতে বাসায় ফিরতেই জানালার এক কোনের কাঁচ ভাঙা দেখল মিতু । জানতে পারলো হঠাৎ নাকি একটা ঢিল এসে পড়েছিল জানালার গায়ে। কাজটা যে সমাজ কীটদের বুঝতে আর বাকি রইলনা মিতুর। রাতে ঘুম আসছেনা। এপাশ ওপাশ করতে করতে চোখ পড়ল কাচঁ ভাঙ্গা জানালার দিকে। জানালার ঐ ভাঙ্গা অংশ দিয়ে মায়াবী চাদেঁর আলো এসে পড়েছে দেয়ালে টানানো রবি ঠাকুরের কিছু উদ্ধৃতির উপর—–

ভোলে থাকা নয় সেতো ভোলা ;
বিস্মৃতির মর্মে বসি রক্তে মোর দিয়েছ যে দোলা।
নয়নসম্মুখে তুমি নাই,
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই।

স্মৃতির মণিকোঠার রঙিন দিনগুলি দোলা দিল মিতুর হ্নদয়ের চারদেয়ালে। আবিরকে ফোনে বললো, তুলতুল ঘুমালে বাইরে আসতে। কাচঁ ভাঙ্গা জানালার কার্নিশে আবিরের প্রিয় লাল ওড়না মাথায় দাঁড়িয়ে আছে মিতু আর পিচঢালা রাস্তার ওপাশে এক মুঠো কোয়ারেন্টাইন ভালবাসা হাতে আবির। যেন লকডাউনে আটকা পড়া ডানাভাঙা কপোত-কপোতী। মৃদু হেসে এক পেকেট চানাচুর মিতুর দিকে ছুড়ে মারলো আবির। আজ জ্যোৎস্না মাখা প্রকৃতি কিংবা নিশ্চুপ রাতের স্নিগ্ধতাও যেন হার মানায় তোমার ওই পদ্মরাঙা রুপে। মেঘ তুমি দূরদেশে যাও, ও চাদঁ আড়ালে লুকাও,আজ শুধু মোর প্রিয়া আপন আলোয় রাঙাবে চারিপাশ। হয়েছে আবির! তুমি ঠিক আগের মতোই রইলে। এখন গেলাম, ভালো থেকো। প্লিজ একটু দাড়াও! না,দেখছো না চানাচুর খাওয়া শেষ তার মানে ভালোবাসাও শেষ।

সত্যিটা হলো সকালে হাসপাতালে যেতে হবে।
রজনীর গভীরতার সাথে সপ্নগুলোর মিতালী জমিয়ে স্ব স্ব স্থানে ঘুমিয়ে পড়লো মিতু আর আবির।
ভোরে রৌদ্রদিপ্ত হাসিতে পৃথিবীকে সূর্য অভিবাদন জানালেও, জীবণ স্বাগত জানায়নি মিতুকে। জ্বর জ্বর আর গলাব্যাথা অনুভব করলো মিতু। উদ্ভেগ আর বিষণ্ণতার জলছাপ পরলো পরিবারটির চোখের কোনে। ল্যাব টিম আসলো স্যাম্পল নিতে আর তার সাথে সাথে প্রতিবেশিরা হুমড়ি খেয়ে পড়লো মিতুর বাড়ির চারদেয়ালের বাহিরে। মিতুদের কেউ বাড়ি ছাড়া করবে,কেউ পুড়িয়ে মারবে,কেউবা আবার জীবন্ত কবর দিবে। কী অযাচিত নির্মমতা! যেখানে নার্সরা মানবতার খোলা প্রান্তরে হামাগুড়ি খেয়ে হলেও করোনা জয়ে নিবেদিত প্রাণ, সেই নার্সরাই আবার বঞ্চিত, নিপিড়িত আর অমানবিকতার যাতাকলে পদদলিত। অবশেষে প্রসাশনিক হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হল। করনাকালীন কোয়ারেন্টাইন দিনগুলো স্বাস্থবিধি মেনে চলা,ধর্মকর্ম পালন,গল্পের বই পড়া আর ভিডিওকলে প্রিয়জনদের সাথে আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতে থাকলো মিতুর। আজ ১৫তম দিনেও স্যাম্পল নেয়া হলো মিতুর। বিকেলে মুক্তির সনদ হিসেবে রিপোর্টে করোনা নেগেটিভ আসলো। অনেক দিন পর নিস্তেজ প্রাণে জীবন্ত সত্তার অনুভূতি পেল মিতু। করতালিতে স্বাগত জানালো পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু সেই করতালিকে স্তব্ধ করে দিয়ে স্বজোরে কানে ভেসেঁ আসলো হাউমাউ কান্নার আওয়াজ। সে আর কেউ নয় প্রতিবেশি রাশেদদের আত্মচিৎকার। জানালা দিয়ে তাকিয়ে বুঝতে পারলো মায়ের করোনার লক্ষণ দেখা দেয়ায় উঠানে মাকে রেখে ভাইবোন দুই কোনে প্রলাপ বকছে। হাসপাতালের গাড়ি আসতে দেখে মিতুও তড়িঘড়ি করে পিপিই পড়ে তৈরি হয়ে আসলো রাশেদর আঙিনায়। বিনয়ের সাথে রাশেদকে বললো,চিন্তা করোনা ভাই আমি যাবো তোমার মায়ের সাথে। আর আজ আমি করোনাকেও জয় করেছি। রাশেদের মায়ের সাথে মিতুও ফিরে চললো হাসপাতাল নামের কোভিড যোদ্ধ ময়দানে।
পিছন থেকে কাঁদোকাঁদো কন্ঠে তুলতুল, মা মা তোমারতো এখন আর করোনা নেই। এখনকি আমায় জরিয়ে ধরবেনা, আদর করে চুমু খাবেনা!
অশ্রু বৃষ্টিতে সিক্ত মিতু বললো,মারে এই ভয়াল করোনাকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। তবে যদি থাকতাম দুদিন পরে হয়তো তোমায় জরিয়ে ধরে চুমু খেতাম। যদি করোনা যোদ্ধে জয়ী হয়ে ফিরে আসি সেদিন তোমায় এমন আদর করবো যা কোনোদিন করিনি। আমিও যে কাঙ্গালিনী হয়ে প্রতিক্ষায় আছি সেই সুদিনের। অবশেষে স্বামী রাতুলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এম্বুলেন্সের যাত্রী হয়ে আবার শুরু হল মিতুর কোভিড যাত্রা।
মিতুরা সত্যিই পারে অমানবিকতার ধামাচাপায় থেকেও মানবিকতার চারা গজাতে। ওরা সূর্য হয়ে দিবালোকে সেবার আালো ছড়ায় আবার রাত্রির কোলে অসুস্থদের সুস্থতায় সেবার ফেরীওয়ালী। ওড়াই রিয়্যাল কোভিড হিরো।স্যালুট!জয় বাংলার নার্স, বিজয় বিশ্ব নার্সিং।

©কপিরাইট ২০২০

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2021
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102