বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০৪:২৮ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ
করোনায় মৃত্যুবরণ করা এক যুবকের শেষ কথাগুলো গ্রাজুয়েট নার্সিং কোর্সের শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানালেন ড. মোহাম্মদ ইউনুস চিকিৎসক, নার্স সহ শীঘ্রই ২০ হাজার নিয়োগ আসছেঃ স্বাস্থ্যমন্ত্রী দারিদ্র ও মেধাবীদের লোনের মাধ্যমে ডিপ্লোমা নার্সিং কোর্সে অধ্যায়নের সুযোগ করোনা ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া সাময়িক স্থগিত করেছে সৌদি সরকার। রাজধানীর দুই নার্সিং শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলো সিলেট ওসমানী বিএনএ বাংলাদেশের নার্সিং শিক্ষা মান্ধাতার আমলেরঃ চট্টগ্রাম মেডিকেলের সাবেক অধ্যক্ষ সেবা নিশ্চিত করতে নার্সদের অভিযোগ সরাসরি জানাতে বললেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বিভাগীয় পর্যায়ে আইসিইউ প্রশিক্ষণ চালু রাখায় ওসমানী বিএনএ’র কৃতজ্ঞতা কক্সবাজারে ৮৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরির সুযোগ বিএসএমএমইউ’তে গ্রাজুয়েট নার্সিং শিক্ষার্থীদের ক্যাপিং সেরিমনি অনুষ্ঠিত

দি রিয়্যাল কোভিড হিরো- ২য় পর্ব।

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০
  • ৫৩১ Time View

🕑২৮.০৫.২০২০ইং

রিমিঝিম বৃষ্টিকণাগুলি মৃদু বাতাসের আলতো বেগে আছড়ে পড়ছে হাসপাতাল করিডোরের মর্গ নামের আঙিনায়। ভিতরে আলাদা একটা কক্ষে একটি মাত্র লাশ। মৃতদেহের বেশ দূরে পাথরের ন্যায় স্থব্দ চিত্তে ঠায় দাঁড়ানো তাগড়া এক হতভাগা যুবক। কোথাও আর কেউ নেই। বাহিরে প্রকৃতির বৃষ্টিক্রন্দন আর ভিতরে যুবকের আত্মক্রন্দন যেন নিজেদের ভাষা-পরিভাষা বিনিময়ের এক হ্নদয়বিদারক দৃশ্যের সূচনা করে চলেছে। কদিন আগেও তূর্য জানতো না কী ঘঠতে চলেছে! সহধর্মিণী শান্তাকে বিয়ের পর থেকেই আদর করে রাঙাবউ বলে ডাকে তূর্য। রাঙাবউ সেদিনও বলেছিল, প্লিজ তুমি স্বাস্থবিধি মানো! কিন্তু কে শোনে কার কথা! বার বার হাত না ধুয়া, ভীড়-জমায়াতে শামিল হওয়া, মাস্ক আর হাঁচিকাশিকে তোয়াক্কা না করা এই করোনাকালে প্রায় নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিনত হয়েছিল তূর্যের। যার চরমপত্র আজ নিজেই পাঠ করছে তূর্য। রাঙাবউয়ের লাশের দিকে তাকিয়ে বার বার বলছে, আমাকে ক্ষমা করে দাও! আমার হেয়ালিপনার জন্যই আজ তুমি, আমি আর আমাদের ছোট্ট কথামনি হাসপাতালে। আমার জন্যই আজ তুমি না ফেরার দেশে চলে গেলে। কী বলে আমি শান্তনা দিবো কথামনিকে! সঙ্গী হারানোর ব্যাথা আর বাচাঁ মরার অদৃশ্য আতঙ্কে কাপঁছে তূর্য।

ঠিক তখনই সামনের দরজা দিয়ে আগাগোড়া আবৃত একদল বাহিনীর আগমন। এরা আর কেউ নয়, কোভিড যোদ্ধে মরদেহ সৎকারে নিবেদিত প্রাণ। শেষবারের মতো কথামনি দেখতে পেল তার মাকে।বাবা ওরা কারা? মাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছে? রাঙা মাকে ঘুম ভেঙে উঠতে বলো!

ওরা ঘুমদৈত্য। তোমার মা বেশ কদিন ধরে অসুস্থতার কারনে ঘুমাতে পারেনিতো তাই ওকে ঘুমের দেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কী করে কথামনিকে বলবে তূর্য! তার রাঙাবউ ঘুমের দেশে নয়, না ফেরার দেশেই পাড়ি দিচ্ছে। কী নির্মম করোনা মৃত্যু!একাকী বিদায়, নিরব নিশ্চুপ পরলোকযাত্রা।

সন্ধায় নার্সিং সুপারভাইজার রুমে ফোন আসলো, বছর চারের শিশু কথামনিকে কোন ভাবেই সামলানো যাচ্ছেনা। কথামনির মা কে চাই। সুপারভাইজার নার্স জোনাকিকে ডেকে পাাঠালেন। কোভিড আক্রান্ত কথামনির সেবার দায়িত্ব দেয়া হলো চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নার্স জোনাকিকে। মাতৃস্নেহের পরশে কথামনির কোভিড বিজয় নিশ্চিত করতে হবে এই নার্সকেই। বাবা তূর্যের সাথে কথা বলে জোনাকি জানতে পারল কথামনি মা শব্দটা লিখতে খুব ভালাবাসে আর বুঝতেও পারে কে আছে এই ছোট্ট শব্দের বিশালতায়?

নিজেকে একজন মা হিসেবে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিলো জোনাকি। কোভিড যোদ্ধের জন্য পিপিই,মাস্ক ইত্যাদি সবকিছু পরে তৈরি যোদ্ধা জোনাকি। আর একজন মা হবার জন্য পিপিই এর গায়ে নার্স পরিচয়টির বদলে লিখে নিলো “মা” শব্দটি। মাতৃস্নেহের ব্যাকুলতায় অস্থির কথামনির সামনে দাঁড়ালো জোনাকি। মা শব্দটি লিখা দেখে জোনাকির সামনে এসে দাঁড়ালো অবুঝ শিশুটি। মা তুমি কোথায় ছিলে? আর তুমিও দেখি ঘুমদৈত্যদের মতো অদ্ভুত পোষাক পরে আছো। আমিতো তুমার হাসি দেখতে পাচ্ছিনা! করোনা নামের খুব দুষ্ঠ একটা অসুখ থেকে বাচঁতে আমি এসব পরেছি। আর এই পোষাকের কারনে আমার কন্ঠও তোমার অচেনা মনে হবে। খুব শিগ্রই তোমাকে আমি এখান থেকে নিয়ে যাব। তবে তার জন্য তোমায় আমার কথা শুনতে হবে। আচ্ছা তুমি আমার হাসি দেখতে চাইছিলেনা! তারপর পিপিই এর গায়ে হাসির ছবি একে নিলো জোনাকি। তা দেখে প্রাণবন্ত হাসির ফোয়ারায় মন ভাসালো কথামনি।খুব ইচ্ছে থাকা সত্বেও কথামনিকে কোলে নিয়ে আদর করতে পারলোনা জোনাকি। কথামনি নার্স জোনাকিকে তার রুমের চারিপাশ দেখতে বললো। দেয়ালে,বিছানায়,চেয়ারে এমনকি ফ্লোরের বিভিন্ন জায়গায় চক দিয়ে কোমল হাতের পরশে শুধু একটি শব্দই লিখা ——-“মা”। যা দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি জোনাকি। আচ্ছা মা,ওই গানটা গাও না!

মধুর আমার মায়ের হাসি চাদেঁর মুখে ঝরে
মাকে মনে পড়ে,আমার মাকে মনে পড়ে।

এখন না, আগে খাওয়াদাওয়া শেষ হোক তারপর। খাবার সময় কথামনি বললো,মা করোনা শেষ হলে আমি কিন্তু তোমার কোলে বসেই খাবো আর তোমাকেও খাইয়ে দিবো। আমরা ছাদে ওঠে ওই দূর আকাশের তারা গুনবো। তুমি কিন্তু চাদঁ মামাকে বলে দিবা, এবার যেন ভালো একটা টিপ দেয় তুমার আর আমার কপোলে! যাতে করোনার নজর না লাগে। হাসছে জোনাকি কিন্তু তার সাথে সাথে অবুঝ শিশুটির সবুজ সরলতার আচড়ে হ্নদয়ে শিশুটির জন্যে একটা জায়গাও তৈরি হচ্ছে। তারপর দিনশেষে রাতের বিষালতায় ঘুমের সাথে আলিঙ্গন করলো কথামনি। আর জীবনের নিশ্চয়তার চেষ্টায় নিশ্বাসের অতন্দ্র প্রহরীর হয়ে জেগে আছে নার্স জোনাকি।

কিন্তু মধ্যরাতে করোনা আর করুণা করেনি কথামনিকে। মা গলাটা ভীষণ ব্যাথা করছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। হ্নদয়ে বিষাদের নেয় মোচড় দিলো জোনাকির। Nasal cannula দিয়ে অক্সিজেন দেয়ার পরও অবস্থার অবনতি হওয়ায় নিবিড় পরিচর্যা কক্ষে নেয়া হলো কথামনিকে। ক্রমশ বাড়তে থাকলো শ্বাসকষ্ট। এদিকে মনিটরে heart rate এর অবনতি হওয়ায় CPR দিতে হলো ছোট্ট কথামনিকে। অবশেষে টিউব ডুকিয়ে ভেন্টিলেটরে দেয়া হলো মানব দেহের এই ক্ষুদ্র অবয়বকে।

সমগ্র কাজে অন্যদের সাথে যথাসম্ভব সাহায্য করলো জোনাকি। জীবণ মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কৃত্রিম ভাবে শ্বাস নিচ্ছে কথামনি। বিষয়টি অবগত করা হলো হাসপাতালের অন্য ফ্লোরে করোনা আক্রান্ত হয়ে ভর্তি কথামনির বাবা তূর্যকে। নির্বাক তূর্যের মূহুর্তগুলো কাটতে লাগলো চাপা কষ্টের বোবাকান্নায়। নিজেকে অপরাধী ভেবে নিঃশেষ হতে চেয়েও পারেনা, শুধু মাত্র মেয়েটির বেচেঁ ফিরে আাসার একবুক আশায়। ওদিকে কথামনির পাশে সমগ্র রজণী বিনিদ্রতায় কাটলো জোনাকির। শুধু অপেক্ষার প্রহর। অবশেষে দুদিন পরে কথামনিকে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র থেকে খুলে দেয়া হল। দিনশেষে কথামনি oxygen cannula ছাড়াও স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে সক্ষম হলো। এই কদিন বেশিরভাগ সময় কথামনির পাশেই ছিলো জোনাকি। কথামনি ফিরে গেল ওয়ার্ডে। কিন্তু ICU অর্থাৎ নিবিড় পরিচর্যা কক্ষে রেখে গেল মমতা মাখা একরাশ মূহুর্ত। কেননা এখানে কর্মরত প্রতিটি নার্সই প্রত্যেকটি রোগীর কখনো মা-বাবা,সন্তান, কখনোবা ভাই-বোন অর্থাৎ আপনজনের ভূমিকা পালন করে থাকেন। বাহিরের জগতের অন্তরালে তারা যেন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সদা জাগ্রত সেবাদূত। এখানে জমদূত আর নার্স যেন বিপরীতমুখী এক প্রতিবিম্ব। জোনাকি, অন্যান্য নার্স সহ ডাক্তার এবং সবার আন্তরিকতায় করোনাকে জয় করলো কথামনি। আজ মু্ক্তির সনদ রির্পোট করোনা নেগেটিভ হাতে বাবার সাথে বাড়ি ফিরবে কথামনি। সবাই ফুলেল শুভেচ্ছা জানালো বাবা আর মেয়েকে।কথামনি তার মাকে ছাড়া বাড়ি ফিরবেনা। শেষবারের মতো পিপিই গায়ে মা লিখা জোনাকি আসলো কথামনির সামনে। বুঝিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য রাজি করালো। কথামনি আজও জানেনা তার রাঙা মা অনেক আাগেই অন্তিম রথে চড়ে পাড়ি দিয়েছে ওপারে। সে বেঁচে থাকবে পিপিই এর মোড়ক ঝেরে কোনো একদিন জোনাকি আসবে তার রাঙা মা হয়ে সেই সপ্ন বিভোরে। যাওয়ার সময় তূর্য জোনাকি কে বললো, আপনাদের প্রতি আমি, কাথমনি আর বিবেকবান সমাজ চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। আর যারা লাইভে এসে মিথ্যাচার করে নার্সরা করোনা যোদ্ধে পরিপূ্র্ণ সেবা দিচ্ছেনা বিধায় করোনায় কম আক্রান্ত হচ্ছে তারা জাতীয় অকৃতজ্ঞ। মানবরুপী অমানুষ চাষাবাদের র‍্যাপিড টেষ্টিং কীট মাত্র।
স্যালুট!জয় বাংলার নার্স, বিজয় বিশ্ব নার্সিং।

লেখক-
ইমাম হোসেন
বিএসসি ইন নার্সিং
হযরত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশকঃ মতিউর রহমান

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2021
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102