সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০৯ পূর্বাহ্ন

মানুষের জন্যে শিক্ষা,আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবস-২০২০

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৫৮৩ Time View

মরিয়ম আক্তার,কুমিল্লা🕧০৮সেপ্টেম্বর২০২০

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯-এর ভয়াবহতার মধ্যে এবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। তাই এবারের স্লোগান হচ্ছে- ‘কোভিড-১৯ সংকট : সাক্ষরতা শিক্ষায় পরিবর্তনশীল শিখন শেখানো কৌশল এবং শিক্ষাবিদদের ভূমিকা’। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় সাক্ষরতার ভূমিকা ব্যাপক, এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবীয় অধিকার। ব্যক্তিগত ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক ও মানবীয় উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণযোগ্য।

এমন কী শিক্ষার সুযোগের বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করে সাক্ষরতার ওপর। সাক্ষরতা হচ্ছে মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি। ১৯৬৭ সালে ইউনেস্কো প্রথম সাক্ষরতার সংজ্ঞা দিলেও প্রতি দশকেই এ সংজ্ঞা পাল্টাতে হয়েছে। এটিই স্বাভাবিক। ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কো এ সংজ্ঞাটি নির্ধারণ করে- যে ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে পারবে, সহজ ও ছোট বাক্য লিখতে পারবে এবং দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ হিসাব-নিকাশ করতে পারবে। কিন্তু এ সংজ্ঞাটিও এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

তার প্রমাণ আমরা কোভিড পরিস্থিতিতে পেয়ে গেছি। একজন ব্যক্তি ভালোভাবে বাংলা পড়তে পারলেন, সাধারণ যোগ-বিয়োগ পারলেন; কিন্তু এ কোভিডকালীন উপরোল্লিখিত ডিভাইসগুলোর সঙ্গে পরিচিত নন, ব্যবহার করতে জানেন না; তাকে আমরা এ পরিস্থিতিতে সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন বলব কিনা, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

একজন মানুষকে সাক্ষর বলা মানে তাকে একটি সার্টিফিকেট প্রদান করা যে, বর্তমান যুগের সঙ্গে তিনি তাল মেলাতে পারছেন। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে তিনি পারছেন না, কাজেই সাক্ষরতার সংজ্ঞা পাল্টে যাবে। আমাদের জীবন পাল্টে গেছে। শিক্ষাদানের পদ্ধতি, শিক্ষাগ্রহণের পদ্ধতিও অনেকটাই পাল্টে গেছে। আরও একটি বিষয় এখানে চলে আসে, সেটি হচ্ছে- বৈশ্বিক এ প্রেক্ষাপটে শুধু নিজের দেশের ভাষায় যদি একজন লোক সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হন, তাতে কিন্তু গ্লোবাল ভিলেজের নাগরিক হিসেবে প্রকৃত অর্থে তিনি সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন নন।

কারণ, যেসব প্রয়োজনীয় তথ্য একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক; সেটি স্বাস্থ্য সম্পর্কিতই হোক আর নিরাপত্তা সম্পর্কিতই হোক, তাকে কিন্তু জানতে হচ্ছে আর সেটি জানার জন্য তাকে একটি গ্লোবাল ল্যাংগুয়েজের সঙ্গে পরিচিত হতে হচ্ছে। যেমন, এখন ফেসবুক, ইউটিউব, মেসেঞ্জার ইত্যাদি সামাজিক মাধ্যমে যা কিছু শেয়ার করা হয়, সেই সাক্ষরতা কিন্তু ইংরেজিতেই করতে হয়। শুধু বাংলায় করলে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী কিংবা রিজিয়ন কিংবা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কাজেই সাক্ষরতার সংজ্ঞা এখন ব্যাপক ও বিস্তৃত হতে বাধ্য।

সাক্ষরতা, শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ এখন শুধু খাতা, কলম, বোর্ড, পড়তে পারা, লিখতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কোভিড-১৯ এক নতুন বিশ্বের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি- বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নিভৃতপল্লীর শিক্ষক থেকে শুরু করে ব্যস্ততম ঢাকার শিক্ষকরাও বিভিন্ন ডিভাইসের মাধ্যমে মিটিং করছেন, ক্লাস পরিচালনা করছেন, কেউ কেউ শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নও করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই জীবনে এই প্রথমবার গুগলমিট, হ্যাংআউট, জুম ইত্যাদির ব্যবহার শিখেছেন। এটি নতুন ধরনের সাক্ষরতা, নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা।

সাক্ষরতার মাধ্যমে গোটা পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করার দক্ষতাটি এখন যুগের চাহিদার কারণেই যুক্ত হয়েছে। কোথায় কোভিডের উৎপত্তি হল, কীভাবে তা দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়াল, কীভাবে মানুষ আক্রান্ত হয়, কীভাবে এ থেকে নিজকে, পরিবারকে রক্ষা করা যায়- এসবই আমরা জানতে পারছি অনলাইনে। যেসব ডিভাইস আমাদের অনলাইনে যুক্ত করছে, সেগুলোর সঙ্গে পরিচয়; সেগুলোর ব্যবহার এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

গোটা পৃথিবীতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে অন্তত ৭০ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংযুক্ত। তরুণদের মধ্যে এ হার আরও বেশি, প্রায় ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ মানুষের রয়েছে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট। ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে ৬০ শতাংশের অন্তত একটি সামাজিক যোগাযোগ প্রোফাইল রয়েছে। তারা দিনে দু’ঘণ্টার বেশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যয় করে। ছাত্র-শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিশু-কিশোর, গৃহিণী, পেশাজীবী- এদের বেশিরভাগেরই এখন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে।

২০১৭ সালের এপ্রিল মাসের জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ সক্রিয়ভাবে ফেসবুক ব্যবহার করছে। বিশ্বব্যাপী ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৫০ কোটি, হোয়াটসঅ্যাপ ১২০ কোটি, ফেসবুক মেসেঞ্জার ১২০ কোটি ও উইচ্যাট ব্যবহারকারী ৯৩ কোটি ৮০ লাখ। আমরা ফেসবুক ব্যবহার করছি কেন? এর উত্তর খুব সহজ।

অলস দেহে সোফায় বসে কিংবা বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে, শীতের রাতে কাঁথা-কম্বলের মধ্যে লুকিয়ে ফেসবুকে দেখতে পাচ্ছি কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার কোন বন্ধু কী করছেন। সেখানকার আবহাওয়া, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সড়কের দৃশ্য ইত্যাদি থেকে শুরু করে দেশের কোন জেলায় কী হচ্ছে, রাজধানীর কোন এলাকায় কী হচ্ছে, কোন সন্ত্রাসী ধরা পড়েছে, কেন পড়েছে, কীভাবে ধরা পড়েছে? কোনো আত্মীয় বা বন্ধু-বান্ধবের সুসংবাদ কিংবা দুঃসংবাদ- সবই এখন হাতের মুঠোয় দেখতে পাচ্ছি ফেসবুকের কল্যাণে।

এ বিষয়গুলোকে সাক্ষরতার অবিচ্ছেদ্য অংশ ধরে নিলে সাক্ষরতার হার কত হবে সে হিসাব নিশ্চয়ই আমাদের কোথাও সেভাবে নেই। প্রচলিত অর্থে দেশে নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা তিন কোটি ২৫ লাখ। তার অর্থ দাঁড়ায়, শতভাগ সাক্ষরতা থেকে আমরা এখনও অনেক দূরে অবস্থান করছি। প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, বৈশ্বিক হিসাবে এখনও ২৬ কোটির বেশি শিশু-কিশোর স্কুলে যায় না এবং প্রায় ৬২ কোটি মানুষ সাক্ষরতা ও হিসাব-নিকাশে ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। অথচ বিশ্বে প্রতি বছর কতশত কোটি টাকা ব্যয় করা হয় মারণাস্ত্র তৈরি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে।

আর দুবাইয়ের বাসিন্দা, যাদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনে একজন কোটিপতি; তারা বিলাসী জীবনের পাশাপাশি নিজেদের ড্রইং রুমে বাঘ, ভালুক আর শিম্পাঞ্জি পুষে। দশ কোটি থেকে একশ’ কোটি টাকা দামের গাড়িতে ঘুরে বেড়ায়। অথচ কোটি কোটি শিশু শুধু দারিদ্র্যের কারণে এখনও নিজ নিজ দেশের বর্ণমালার সঙ্গেই পরিচিত নয়। এ বৈপরীত্য মোকাবেলা করার মতো নেতৃত্ব বিশ্বে প্রয়োজন।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে শিক্ষা রয়েছে ৪ নম্বরে। এখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষ ও মানসম্মত শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রাটি অর্জিত হলে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের পক্ষে উন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কাজটি সহজে হয়ে যেতে পারে।

শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত মানুষদের সাক্ষরতাদানের উদ্দেশ্যেই ৮ সেপ্টেম্বর সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়ে আসছে। করোনাকালে ১৮৫টি দেশের ১৫৪ কোটি ২৪ লাখ ১২ হাজার শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। তাদের জীবনে এর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি। ডিজিটাল শিখন প্রক্রিয়ায় শিক্ষার গুণগত মান ও ডিজিটাল অ্যাকসেসের বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের ডিজিটাল অ্যাকসেস রয়েছে। এটিই হচ্ছে ডিজিটাল শিখন প্রক্রিয়ার বড় বাধা; কারণ চল্লিশ শতাংশকে আমরা ছুঁতে পারছি না, ডিজিটাল শিখনের আওতায় আনতে পারছি না।

অনেক শিক্ষার্থী লাইভ ক্লাস করতে না পারলেও সেগুলো হোয়াটসঅ্যাপ বা ই-মেইলের মাধ্যমে চালাচালি করে শিখন প্রক্রিয়াটা এগিয়ে নিচ্ছে। তারপরও ডিজিটাল অ্যাকসেসে এগিয়ে থাকা পরিবারগুলোর শিক্ষার্থীদের তুলনায় ডিজিটালি পিছিয়ে থাকা এলাকা বা পরিবারের শিক্ষার্থীরা অনেক পিছিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল ডিভাইস ও ডেটাপ্ল্যানের ব্যয় মেটাতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

ঝরে পড়া মানে সাক্ষরতা থেকে দূরে চলে যাওয়া। তাই পুরো বিশ্বের ডিজিটাল অ্যাকসেস ব্যয় হ্রাস ও ডিজিটাল সেবার গুণমান বৃদ্ধি করা না হলে শিক্ষার মানের ব্যবধান এবং একইভাবে আর্থ-সামাজিক সমতার ব্যবধান আরও বেড়ে যাবে। আর এতে ডিজিটাল বিভাজন চরম আকার ধারণ করতে পারে। নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়গুলোর দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া জরুরি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2021
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102